ইসলামী সূত্র

  • features

    1. home

    2. article

    3. শাশ্বত মোজেজা : পবিত্র কোরআন (১-৫)

    শাশ্বত মোজেজা : পবিত্র কোরআন (১-৫)

    শাশ্বত মোজেজা : পবিত্র কোরআন (১-৫)
    Rate this post

    এক.

    অবিনশ্বর ও চিরন্তন অলৌকিকতায় ভরপুর পবিত্র কোরআনই একমাত্র খোদায়ি মহাগ্রন্থ যা সব যুগেই মানুষকে কল্যাণের অশেষ ধারায় সিক্ত করতে সক্ষম। এর নিত্য-নতুন কল্যাণ ও আকর্ষণ অফুরন্ত। তাই প্রথম থেকেই চিরনবীন আলকোরআন অলৌকিক বিস্ময়ের অশেষ উৎস।

    ইতিহাস সাক্ষী, পবিত্র কোরআনই মানব জাতির ওপর এবং তাদের সভ্যতা সংস্কৃতির ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে । এ মহাগ্রন্থের শিক্ষা খুব দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সমীহ আদায় করতে সক্ষম হয়। বিশ্বের বিশাল ভূখন্ডে অনেক জাতির কুসংস্কারাচ্ছন্ন সংস্কৃতি একত্ববাদের এ ঐশী আলোর প্রভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। জ্ঞানের এই অতলান্ত সাগরের মুনি-মুক্তার ভান্ডার থেকে যতই মনি মুক্তা আহরণ করা হোক না কেন তা চিরকালই অজস্র ও অপরিমেয়ই থেকে যাবে। এ ছাড়াও পবিত্র কোরআনের জ্ঞানসাগরের অজস্র দিক গবেষকদের কাছেও অজানা রয়ে গেছে।
    কেউ কেউ মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জীবনে পবিত্র কোরআনকে সূর্যের সাথে তুলনা করেছেন। সূর্যের কেবল একটি দিক দৃশ্যমান। এ মহাগ্রন্থ সূর্যের আলোর মতই প্রাণ সঞ্চারক ও ঔজ্জ্বল্য ছড়ায়। কিন্তু এর সব দিকের প্রতি লক্ষ্য করা মানুষের সাধ্যাতীত।
    বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম বাকের (আঃ) বলেছেন, “পবিত্র কোরআনকে সূর্য ও চাঁদের সাথে তুলনা করা যায়। সূর্য ও চাঁদ সব সময়ই ছিল এবং সব সময়ই পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষকেই আলো দিয়ে আসছে। এভাবে কোরআনও চিরকাল (সব যুগের ও সব অঞ্চলের) মানুষকে আলো দিয়ে যাবে।”
    অবশ্য মানুষ তার ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী এ মহাগ্রন্থ থেকে শক্তি ও হেদায়াত বা সুপথের দিশা পাবে। ব্যাপারটি এমন নয় যে, কোনো এক প্রজন্ম কোরআনের বা সূর্যের আলো ব্যবহার করায় পরবর্তী প্রজন্ম তা থেকে আর আলোই পাবে না, অথবা কম আলো পাবে। সুরা ইব্রাহিমের প্রথম আয়াতেই মহান আল্লাহ বলেছেন, “এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি-যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন-পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য পালনকর্তার নির্দেশে তাঁরই পথের দিকে।”
    অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ইসলামের শত্রুরা পবিত্র কোরআনের কপি পুড়িয়ে বা তা বিকৃত করার মাধ্যমে এর প্রতি অবমাননার যেসব কাজে জড়িত হচ্ছে তা মানুষের ওপর এই মহাগ্রন্থের বিস্ময়কর প্রভাবের প্রতিহিংসামূলক প্রতিক্রিয়া। মজার ব্যাপার হল, ইসলাম ও কোরআন-বিদ্বেষী এ ধরনের তৎপরতা সত্ত্বেও কোরআনের প্রতি অমুসলমানদের আগ্রহ দিনকে দিন বাড়ছে এবং বাড়ছে ইসলামে দীক্ষিতের সংখ্যা। এটাও পবিত্র কোরআনের আরেকটি মোজেজা বা অলৌকিকত্ব।

    বৃটিশ লেখক কেন্ট গ্রেইক “কোরআনকে কিভাবে চিনেছি” শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ” একজন মুসলিম নারী ও পুরুষের ওপর কোরআনের যে প্রভাব তা এ মহাগ্রন্থের প্রতি তাদের বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত এবং এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার মত একজন অমুসলিম কোরআন সম্পর্কে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াই যখন তা খুলে পড়তে শুরু করি তখনও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা অসম্ভব। এভাবে অমুসলমি কেউ যতই কোরআন পড়তে থাকে ততই তার ওপর এ গ্রন্থের প্রভাবও বাড়তেই থাকে। আর এটা বিস্ময়কর বা ব্যতিক্রমধর্মী ব্যাপার।”
    বৃটিশ লেখক কেন্ট গ্রেইক আরো লিখেছেন,”আমরা ইংরেজরা ১৪০০ বছর আগে বৃটেন ও আশপাশের বৃটিশ দ্বীপগুলোতে প্রচলিত ভাষাগুলো বুঝতে পারি না। ভাষা বিশেষজ্ঞ ফরাসি অধ্যাপকও ১৪০০ বছর আগের ফরাসি ভাষা বোঝেন না। কিন্তু কোরআনের ভাষায় সেকেলে হয়ে পড়ার এমন কোনো নজির নেই। আমরা যখন কোরআন পড়ি তখন মনে হয় যেন কোনো আরব দেশের আধুনিক সংবাদপত্র বা বই পড়ছি।”

    জার্মানির মহাকবি গ্যাটে পবিত্র কোরআন পড়ে এত গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যে এ মহাগ্রন্থের দশটি সুন্দর সূরা তিনি নোট করে রাখেন। নিজ শিক্ষকের কাছে লেখা চিঠিতে গ্যাটে লিখেছেন, “কোরআন মহত্ত্ব, কল্যাণ ও বিস্ময়কর বাস্তবতায় ভরপুর। .. … হযরত মূসা (আঃ)’র যে দোয়ার কথা কোরআনে উল্লেখিত হয়েছে সেভাবেই আপনার জন্য প্রার্থণা করতে চাই। যেখানে বলা হয়েছে যে, “মূসা বললেনঃ হে আমার পালনকর্তা আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন,আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। (সূরা ত্বাহা, ২৫-২৮)”
    কোরআনের এই আয়াত অনুযায়ী মানুষ মহান আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে এবং সর্বরোগ নিরাময়কারী ইসলামী চিন্তাধারার ওপর বিশ্বাসের বলে নিজেকে ভয়, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম।

    গ্যাটে “প্রাচ্যের কাব্য” শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে মনোজ্ঞ এক কবিতায় বলেছেন, কোরআন সম্পর্কে কোনো কোনো বিতর্ক নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। এরপর তিনি বলেছেন, “… শুধু এটাই জানি যে, কোরআন বইয়ের রাজা। “

    পবিত্র কোরআন সৃষ্টি জগতের নানা রহস্য, উচ্চতর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, নৈতিক ও জীবন গড়ার শিক্ষাসহ অশেষ জ্ঞান এবং তথ্যের উৎসে ভরপুর। খোদায়ী এ মহাগ্রন্থ নিজেকে আলোর মত পবিত্র ও সুন্দর এবং সত্য ও মিথ্যার স্পষ্টতম পার্থক্যকারী প্রভৃতি নামে অভিহিত করেছে। পবিত্র কোরআন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় আল্লাহর কথা। উল্লেখ করে মহান আল্লাহর অনেক সুন্দর নাম ও গুণ। যেমন, তিনিই সৃষ্টিকূলের ও সব অভিনবত্বের উৎস। এ মহান গ্রন্থ সব সময়ই আল্লাহর এবাদত ও একত্ববাদের ওপর অবিচল থাকার পথ দেখায় মানুষকে। পবিত্র কোরআনে রয়েছে ফেরেশতা, আসমানি গ্রন্থ ও নবী-রাসূলদের বর্ণনা। সৃষ্টির সূচনা, ক্রমবিকাশ ও সমাপ্তি তথা পরকাল এবং আল্লাহর কাছে সব কিছু ফিরে যাওয়ার কথা। সর্বোপরি অনন্য এ ঐশী গ্রন্থে রয়েছে মানুষের মুক্তি বা সৌভাগ্য ও দূর্ভোগের পথ । কোরআনে কখনও মিথ্যা বা বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেনি ও ভবিষ্যতেও ঘটবে না। কারণ, আল্লাহই বলেছেন, “এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই , পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। (হা মিম সিজদা-৪২)

    চিরমধুর, চিরনবীন ও বিশ্বজনীন গ্রন্থ আল কোরআনের উপযোগীতা সব যুগে এবং সব স্থানেই কার্যকর রয়েছে। বিশেষ কোনো জাতির জন্য অবতীর্ণ হয়নি এ ঐশী গ্রন্থ। কোরআনের বহু আয়াতে ” হে মানবজাতি বা হে মানুষ ” শীর্ষক সম্বোধন এর অন্যতম প্রমাণ। একই কারণে নিজেকে ” বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ” ও “মানবজাতির জন্য সতর্ককারী” বলে উল্লেখ করেছে এ মহাগ্রন্থ। অতীতের নবী-রসূল ও জাতিগুলোর কাহিনী থেকে কোরআন শুধু শিক্ষনীয় অংশই উল্লেখ করেছে। কোরআনের বাণীর সুপ্ত অর্থগুলোর ব্যাখ্যা করা হয় নানা দিক থেকে। এভাবে অনেক নতুন তথ্য ও অর্থ বেরিয়ে আসায় সব সময়ই নতুনত্বের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখছে কোরআন।

    দুই.

    পবিত্র কোরআনের সূরা আসরার নয় নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল এবং সৎকর্ম পরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার।”
    বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নবুওয়্যত লাভের পর পবিত্র কোরআন তাঁর ওপর নাজেল হয়। সে যুগে কবিতা রচনাসহ ছন্দবিদ্যা ও অলংকার শাস্ত্র এবং আবৃত্তিতে আরবরা বেশ দক্ষতা অর্জন করেছিল। জাহেলি যুগে “ওকাজ” নামক বাজার বা মেলায় আরব শিল্পীরা শ্রেষ্ঠ শিল্প ও সাহিত্য-কর্ম নিয়ে উপস্থিত হত। বিচারক ও সমালোচকরা সেরা কবিতা বা কাসিদাগুলো নির্বাচন শেষে সেগুলোর কথা ঘোষণা করতেন। সবচেয়ে সেরা কবিতা বা কাসিদাটি সোনার অক্ষরে লেখা হত এবং তা কাবা ঘরে ঝুলিয়ে রাখা হত। সবাই বিস্ময়কর ওই শিল্পকর্ম দেখতে যেত। “মুআল্লাক্বাতুস সাবআ” নামে খ্যাত সপ্ত কাসিদা ছিল আরবের বিখ্যাত কবিদের রচনা। সেযুগে তাদের ওইসব রচনাকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রচনা হিসেবে ধরা হত। কিন্তু পবিত্র কোরআন নাজেল হওয়ার পর এর অলৌকিক ভাষা-শৈলী, প্রকাশ-ভঙ্গী ও সাহিত্য-মান মানুষের অন্তরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে সেরা আরব কবিরা লজ্জায় মুখ লুকাতে বাধ্য হন। সপ্ত কাসিদার অন্যতম কাসিদার রচয়িতা ও অন্যতম সেরা আরব কবি “লবিদ বিন রবিয়া” পবিত্র কোরআনের সাথে পরিচিত হওয়ার পর এ মহাগ্রন্থের ভাষায় এতটা আকৃষ্ট হন যে তিনি এরপর আর কখনও কবিতা লেখেননি। বরং সব সময়ই কোরআন পড়ার চেষ্টা করতেন। কেন কবিতা লিখছেন না, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কোরআন আত্মপ্রকাশের কারণে কবিতা রচনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। কোরআনের বক্তব্যের বিপরীতে আমাদের বক্তব্য অর্থহীন ও প্রলাপ মাত্র। আমি কোরআন পড়ে এত মজা পাই যে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের কোনো বক্তব্য আছে বলে আমার জানা নেই। “

    পবিত্র কোরআন প্রকাশের মাধ্যমে নিরক্ষর মহানবী (সাঃ)’র নবুওয়্যাতের সত্যতা প্রমাণিত হয়। এ ঐশী গ্রন্থের হৃদয় নাড়া-দেয়া বিস্ময়কর আয়াতগুলো অলৌকিকতার স্পষ্ট নিদর্শন। বিশেষ করে মক্কায় নাজেল হওয়া ছোট সূরাগুলোর ছন্দ-মিল ও অন্তমিল, পদ্যময় লালিত্য ও ধ্বনি-মাধুর্য অত্যন্ত উচ্চ মানের। কোরআনের সুললিত ও প্রাণসঞ্চারক বাণীগুলো বড় বড় বাগ্মী ও কবিদের এটা বলতে বাধ্য করেছে যে, “এ বই পুরোপুরি গদ্যও নয়, পুরোপুরি পদ্যও নয়, কেবল কোরআনই কোরআনের তুলনা।”

    পবিত্র কোরআনের সূরা ও আয়াতগুলো আরবদের মধ্যে দ্বিমুখী এবং বিপরীতমুখি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। একদিকে তারা কোরআনের হৃদয়স্পর্শী আয়াত শুনে মুগ্ধ হত। এসব আয়াতের অভূতপূর্ব আলংকারিক সৌন্দর্য্য, অভিনবত্ব ও সাহিত্য-মান তাদেরকে অভিভূত করত। অন্যদিকে এসব আয়াতের বিষয়বস্তু তাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সেগুলো মেনে নেয়া বা সমর্থন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বাপদাদার যুগ থেকে প্রচলিত প্রথা, বিশ্বাস ও কুসংস্কার ত্যাগ করা তাদের জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু পবিত্র কোরআনের অকাট্য যুক্তি এবং বুদ্ধি ও বিবেক খাটানোর জন্য এর আহ্বানের জবাব দেয়ার মত ক্ষমতাও তাদের ছিল না। অবশ্য আরবদের অনেকেই কোরআনের হৃদয়-ছোঁয়া বাণী শুনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে অনেকেই মহানবী (সাঃ)’র বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছে।

    পবিত্র কোরআনের আলোয় ধীরে ধীরে হিজাজের অজ্ঞতা ও শির্কের ঘাঁটিগুলো বিলুপ্ত হয় এবং ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে গোটা আরব উপদ্বীপ । বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র ইন্তেকালের পর মুসলিম ভূখণ্ডে বিভিন্ন গ্রুপ কোরআনের বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা শুরু করায় অনেক বিশেষজ্ঞ ও মুফাসসির পবিত্র কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরার উদ্যোগ নেন। হিজরি তৃতীয় শতক থেকে নবম শতক পর্যন্ত বহু জ্ঞানি ও বিশেষজ্ঞ পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অনেক জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য তুলে ধরেছেন। প্রখ্যাত আরব সাহিত্যিক জাহেজ “নজমুল কোরআন” নামক বইয়ে এ মহাগ্রন্থকে সাহিত্যের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ও অবিনশ্বর গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেছেন। হিজরি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে ফাখরে রাজি, অস্টম ও নবম শতকে সিয়ুতি পবিত্র কোরআনের অশেষ জ্ঞান ও চিরন্তন বাস্তবতাগুলো সম্পর্কে অনেক তথ্য তুলে ধরেছেন।

    সুন্দর ও সুদৃঢ় ভবনের জন্য যেমন উন্নত বা মজবুত নির্মাণ-সামগ্রী ও সুদক্ষ পরিকল্পনা জরুরি তেম্নি বাণী বা বক্তব্যের সৌন্দর্য্য ও বলিষ্ঠতার জন্য দরকার প্রাঞ্জল ও জোরালো শব্দের পাশাপাশি সুগঠিত বাক্য। এ বিষয়টি পাঠকদের ওপর পবিত্র কোরআনের ব্যাপক প্রভাবের অন্যতম রহস্য।
    মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সূরা জুমারের ২৩ নম্বর আয়াতে এ মহাগ্রন্থকে শ্রেষ্ঠ বাণী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন,যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পূনঃ পূনঃ পঠিত।” এখানে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে কোরআনের আয়াতগুলো যে সবই সুন্দর, সুললিত, সমন্বিত এবং পরস্পর-বিরোধীতা বা বৈপরীত্য থেকে মুক্ত তা বোঝানো হয়েছে। মানুষের কথার মত কোরআনের কোনো কথা হাল্কা মানের ও কোনো কথা গভীর ভাবার্থপূর্ণ এমন নয়। কোরআনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সূরা জুমারের ২৩ নম্বর আয়াতে আরো বলা হয়েছে, “এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের ভেতর বা অন্তর ও বাহির আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথ নির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। “

    পবিত্র কোরআনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, খোদাভীরুরা যখন এর আয়াত শোনে তখন তাদের শরীরে কাঁপন সৃষ্টি হয় এবং তাদের ভেতর ও বাইর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এই ভয় থেকে সূচিত হয় জাগরণ ও সক্রিয়তা এবং দায়িত্ব-সচেতনতা। যাদের মনে সত্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত তারা কোরআনের বাণী শুনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। সত্যকে মেনে নেয়ার জন্য তাদের মধ্যে বিনম্র ভাব সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে তারা প্রশান্তি পায়। কোরআনের পাঠক সতর্ককারী আয়াত পড়ে চিন্তায় বিভোর হয় এবং মহান আল্লাহর বিভিন্ন নিদর্শন, নেয়ামত ও দয়া সম্পর্কিত আয়াত পড়ার পর প্রশান্ত হয়। মহানবী (সাঃ)’র সাহাবীরা যখন কোরআনের আয়াত শুনতেন তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু বইত এবং কেঁপে উঠত শরীর। সুসংবাদমূলক আয়াত পড়ে বা শুনে এমনভাবে আনন্দিত হতেন যেন তারা বেহেশত দেখতে পাচ্ছেন এবং অনুরূপভাবে সতর্কতামূলক আয়াত শুনে বা পড়ে তারা অন্তরের কান দিয়ে দোযখে পাপীদের কান্না ও অগ্নিশিখার গর্জন শুনতেন।
    পবিত্র কোরআনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, কোনো কোনো বক্তব্য ও ঘটনার পুণরাবৃত্তি। এসব পুনরাবৃত্তি মোটেই একঘেয়ে নয়, বরং সৃষ্টিশীল ও নতুনত্বে ভরপুর হওয়ায় অত্যন্ত মনোজ্ঞ ও আকর্ষনীয়। কোনো কিছুর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আধুনিক যোগাযোগ-বিদ্যায়ও সৃষ্টিশীল পুনরাবৃত্তিকে খুবই কার্যকর পন্থা বলে ধরা হয়। এ ছাড়াও পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যাকারদের মতে, পুনরুল্লোখিত আয়াতগুলো পরস্পরকে ব্যাখ্যা করে এবং অনেক অস্পষ্টতা দূর করে। #

    তিন.

    সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ পবিত্র কোরআন যে কোনো মানুষের রচিত গ্রন্থ হতে পারে না তা অনেক অমুসলিম জ্ঞানী-গুণীও স্বীকার করেছেন। সব যুগের মানুষের জন্য অফুরন্ত কল্যাণ, মুক্তি ও সৌভাগ্যের দিশারী এ বইয়ের অলৌকিকতাও চিরস্থায়ী।
    বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)’র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আঃ) বলেছেন, “পবিত্র কোরআন পূর্ববর্তী ও নতুন সব যুগের মানুষের জন্য প্রামাণ্য আদর্শ বা হুজ্জাত। তাই প্রত্যেক প্রজন্মের কাছেই কোরআন সজীব ও নতুন। যারা বার বার পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন করে ও এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করে তারা প্রত্যেক বারই এর মধ্যে নতুন কিছু দিক খুঁজে পায়। কোনো কবিতা বা ভাষণের এ ধরণের বৈশিষ্ট্য নেই।”

    পবিত্র কোরআনের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই এর প্রতি মুসলমানরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বিশ্বনবী (সাঃ)’র মোজেজা এই কোরআন থেকেই উদ্ভুত। তিনি মানুষকে এ মহাগ্রন্থের মাধ্যমে মুক্তি ও সৌভাগ্যের দিশা দেখিয়ে গেছেন।
    মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশকে ছাত্রদের ক্লাসের সাথে তুলনা করা হলে এটা বলা যায় যে, প্রাচীন যুগে মানুষের মধ্যে তথ্যের অভাব ছিল এবং চিন্তাভাবনার ক্ষমতা অতটা বিকশিত ছিল না বলে মহান আল্লাহ তাদেরকে সুপথ দেখানোর জন্য সহজ সরল বই নাজেল ও প্রাথমিক কর্মসূচীর বা বিধি-বিধানের ব্যবস্থা করেছিলেন। পরে ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা ও বুদ্ধি যতই বিকশিত হয়েছে ততই তাদের উন্নততর বই ও বিধি-বিধান দেয়া হয়েছে । মানুষের বুদ্ধি-বিবেক ও চিন্তা যখন পরিপক্কতা পেল তখনই তাদেরকে দেয়া হল জীবনের সব দিকের পরিপূর্ণ বিধি-বিধান সম্বলিত গ্রন্থ কোরআন। এ মহাগ্রন্থ এতই পরিপূর্ণ যে, মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে এরপর আর কোনো বই বা জীবন বিধান মানুষের দরকার নেই। বিশ্বনবী (সাঃ)’র যুগে তাঁর কাছে যে কোরআন নাযেল হয়েছিল তা এখনও অবিকৃত রয়েছে। কারণ, মহানবী (সাঃ) ওহি লেখকদের মাধ্যমে পবিত্র কোরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন। হিজরি ২৮ সনে পবিত্র কোরআনের কয়েকটি কপি সংকলিত হয়েছিল এবং সবাইকে সেগুলো পড়ার ও ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হত।
    পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল- মানুষের চিন্তা ও আচরণ সংশোধনে এর গঠনমূলক ভূমিকা। কোরআন নিজেকে সব মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক বলে উল্লেখ করেছে। সূরা মুদাসসিরের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, ” এই কোরআন তো মানুষের জন্যে উপদেশদাতা ও সতর্ককারী ছাড়া অন্য কিছু নয় ”
    মানুষ তার আত্মাকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করার জন্য সব কিছুর আগে কোরআনের শরণাপন্ন হতে পারে। কোরআন অধ্যয়ন আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের অন্যতম যোগসূত্র এবং খোদায়ি জ্ঞানের সাগরে অবগাহনের মাধ্যমে মানুষ বস্তুগত আকর্ষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারে।
    মানুষের নৈতিক ও আত্মিক রোগগুলোর মূল শেকড় চিহ্নিত করে এসব রোগের চিকিৎসা করা উচিত। তা না হলে একটা পর্যায়ে এসব রোগ সারানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। পবিত্র কোরআনের সূরা ইসরার ৮২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত।”

    পবিত্র কোরআন বিভিন্ন আয়াতে ফেরাউন, কারুন ও বালাম বাউরের মত মানসিক রোগীদের রোগ চিহ্নিত করেছে। এ মহাগ্রন্থ নৈতিক সংকটগুলোর চিকিৎসা-বিধান কখনও গল্প ও কখনও উপমার মাধ্যমে, আবার কখনও স্পষ্ট ভাষায় বা সরাসরি তুলে ধরেছে। পবিত্র কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, হিংসা, অহংকার ও লোভের মত বিভিন্ন মন্দ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় যুগে যুগে মানুষ নানা সংঘাত ও যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। হিংসা ও ক্ষোভের বশীভূত হওয়ার কারণেই হাবিলকে হত্যা করেছিল তারই ভাই কাবিল।
    পবিত্র কোরআন মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি বলে উল্লেখ করে তাকে সম্মান দিয়েছে। এভাবে কোরআন মানুষের মধ্যকার ধ্বংসাত্মক প্রবণতা নির্মূল করে ও ঈমানি চেতনা জাগিয়ে তুলে মানব জীবনকে অর্থপূর্ণ ও লক্ষ্যপূর্ণ করে। এ জন্যই সূরা ইউনুসের ৫৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবানী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং এতে রয়েছে মুসলমানদের জন্য অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত ।
    সূরা ফুসিলাতের ৪১ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছে, বলুন, “এটা (কোরআন) বিশ্বাসীদের জন্য হেদায়েত ও রোগের প্রতিকার।”
    এভাবে কোরআন সুস্থতা ও সঠিক পথ বাতলে দেয় এবং অসুস্থতা ও মন্দ পথ থেকে দূরে থাকার পদ্ধতিও শিখিয়ে দেয়।
    আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, ” পবিত্র কোরআনে রয়েছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণাগুলোর চিকিৎসা। যেমন, এতে রয়েছে খোদাদ্রোহীতা বা কুফরি, নিফাক্ব বা কপটতা ও পথভ্রষ্টতার মত রোগের চিকিৎসা।” তিনি আরো বলেছেন, ” জেনে রাখ, পবিত্র কোরআনে রয়েছে ভবিষ্যদ্বাণী, নানা ঘটনার বর্ণনা, নানা রোগের চিকিৎসা, তোমাদের সামাজিক জীবনের বিধি-বিধান… আল্লাহর কিতাবকে শক্ত করে ধর। কারণ এ বই অত্যন্ত শক্ত রশি এবং চিরন্তন আলো…. যে কেউ কোরআন আকড়ে ধরবে সে মুক্তি পাবে।”

    ইসলামের প্রাথমিক যুগে কোরআনের শিক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের সাথে জাহেলি বা অজ্ঞতার যুগের লোকদের তুলনা করলে এ মহাগ্রন্থের অসাধারণ প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। মূর্তিপূজারী, অজ্ঞ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরবরা রাসূল (সাঃ)’র মাধ্যমে প্রচারিত পবিত্র কোরআনের শিক্ষার প্রভাবে ঈমান ও হেদায়াতের আলো লাভ করে।
    এভাবে পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে ইসলাম সৃষ্টি করেছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা-ভিত্তিক এমন এক মহান সভ্যতা যা সমাজের শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তির পথ নিশ্চিত করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, একদল লোক রাসূল (সাঃ)’র ওপর ঈমান না আনা সত্ত্বেও তাদের ভেতরকার আত্মিক চাহিদার টানে গোপনে রাসূল (সাঃ)’র ঘরের আশপাশে সমবেত হয়ে তাঁর মুখে উচ্চারিত পবিত্র কোরআনের হৃদয়-জুড়ানো ও জ্ঞান-প্রদীপ্ত আয়াতের বাণী শুনত।
    পবিত্র কোরআনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এ মহাগ্রন্থ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও তারা সব সময় সব বিষয়ে সুপথ বা সঠিক পথটি চিনতে সক্ষম হয় না। কারণ, বিশ্বে অনেক কিছুই সত্য ও মিথ্যায় মিশ্রিত বা অস্পষ্ট। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ অজ্ঞতা ও মিথ্যার অন্ধকারকে দূর করার জন্য বিশ্বনবী (সাঃ)’র মাধ্যমে মানব জাতিকে দান করেছেন পবিত্র কোরআনের আলো। মহান আল্লাহর দেয়া শ্রেষ্ঠ এ উপহার থেকে উপকৃত হবার পথও দেখিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠ নবী (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মাধ্যমে।
    চার.

    মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আররহমানে সৃষ্টি জগতের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা মহান আল্লাহর অশেষ বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক নেয়ামতগুলোর মধ্য থেকে কিছু নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। সৃষ্টিকূলের বিস্ময়কর নানা রহস্যের কথাও তুলে ধরেছেন এ সুরায়। যেমন, “তিনি পাশাপাশি দুই দরিয়া প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল যা তারা অতিক্রম করে না।”
    এ ধরনের অনেক বিস্ময়কর সৃষ্টি রহস্যের কথা তুলে ধরে এ সুরায় মহান আল্লাহ বার বার বলেছেন, “অতএব,তোমরা মানুষ ও জিন তোমাদের পালনকর্তার কোন্ কোন্া অবদানকে অস্বীকার করবে?”লক্ষনীয় বিষয় হ’ল এ সুরায় উল্লেখিত সমস্ত খোদায়ী নেয়ামতগুলোর মধ্যে প্রথমে আল্লাহর করুণার কথা এবং এরপরই পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাই আমাদের উচিত কোরআন সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞান অর্জন করা এবং এর শিক্ষাগুলোকে নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করা। কারণ, কোরআন অনেক বাস্তবতা বা সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি মানুষকে দেখায় সৌভাগ্যের পথ।

    কেউ অর্থ-সম্পদে দরিদ্র বা নিঃস্ব হলেও তার মধ্যে যদি থাকে কোরআনের শিক্ষা ও সম্পদ তাহলে সেই প্রকৃত ধনী এবং তার জীবনে দুঃখ করার মত কিছুই নেই।

    পবিত্র কোরআনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, আসমানি বা অন্য ঐশী গ্রন্থগুলোর ওপর এ মহাগ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্ব। কারণ, পবিত্র কোরআনের অতীতের ঐশী গ্রন্থগুলোকে সত্যায়ন করে এবং মানব সভ্যতার জ্ঞানগত পরিপূর্ণতার আলোকে একমাত্র এ মহাগ্রন্থেই মানব জীবনের জন্য জরুরি পরিপূর্ণ শিক্ষা ও কর্মসূচী তুলে ধরা হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ২ থেকে ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “তিনি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন সত্যতার সাথে; যা সত্যায়ন করে পূর্ববর্তী কিতাবসমুহের। তিনি এ কিতাবের পূর্বে,নাযিল করেছেন তাওরাত ও ইঞ্জিল, মানুষের হেদায়েতের জন্যে এবং অবতীর্ণ করেছেন মীমাংসা। …”
    পবিত্র কোরআনের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, এ মহাগ্রন্থ দুইবার মহানবী (সাঃ)’র ওপর নাজেল হয়েছে। প্রথমে একবার পুরো কোরআনের আয়াত রাসূল (সাঃ)’র অন্তরে নাজেল হয় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা উপলক্ষে নাজেল হয় এ মহাগ্রন্থ। তাই এ ঐশী গ্রন্থে মিথ্যা বা ভুলের কোনো অবকাশ নেই। এর বিধি-বিধান মানুষের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

    তাওরাত ও ইঞ্জিলের মত গ্রন্থগুলো ঐশী গ্রন্থ হলেও সেগুলো কেবল বিশেষ যুগের বিশেষ সম্প্রদায়ের সামাজিক ও চিন্তাগত অবস্থার প্রেক্ষাপটে নাজেল হয়েছে এবং সেগুলোর বেশির ভাগই কেবল নির্দিষ্ট যুগের জন্য প্রযোজ্য ও সীমিত। কিন্তু পবিত্র কোরআনের উপযোগীতা কালোত্তীর্ণ এবং তা বিশেষ কোনো জাতি ও যুগের জন্য নির্দিষ্ট নয়। কোরআনের বাণী সব যুগেই মানুষের জন্য সজীব, নতুন ও প্রাণবন্ত হয়ে বিরাজ করছে যা কেবল এ মহাগ্রন্থেরই অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং এর অন্যতম প্রধান অলৌকিকতা।

    দুঃখজনকভাবে অতীতের ঐশী গ্রন্থগুলো বিকৃত হয়ে গেছে এবং সেগুলোর আদিরূপ বা অবিকৃত সংস্করণ আর পাওয়া যায় না। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পুরোপুরি অবিকৃত ও অক্ষত থেকে গেছে পবিত্র কোরআন। এর প্রমাণ হল, এতে তৌহিদ বা একত্ববাদ এবং আল্লাহর পরিচয় এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে তা যৌক্তিক ও মহান আল্লাহর মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাওরাত ও ইঞ্জিলের মত বিকৃত হয়ে যাওয়া ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে অনেক কূসংস্কার স্থান করে নিয়েছে এবং আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা ও নবীদের সম্পর্কে অনেক অমর্যাদাপূর্ণ বক্তব্য দেখা যায় এসব বইয়ে।
    পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহ সব ধরণের ত্রুটি ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত, তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং একমাত্র তিনিই ইবাদত বা উপাসনা পাওয়ার যোগ্য। আকাশ ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁরই। তিনি চিরঞ্জীব ও স্বয়ম্ভু বা স্বয়ং-সৃষ্ট তথা স্ব-অস্তিত্বশীল। অর্থাৎ কেউই তাঁকে অস্তিত্বে আনেননি।
    সর্বশেষ ঐশী মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনে অতীতের নবী-রাসূলদের কথা উল্লেখ করেছে এবং সবচেয়ে সুন্দরভাবে তাঁদের পরিচয় তুলে ধরেছে। পবিত্র কোরআন তাঁদের সৎ গুণাবলীর প্রশংসা করেছে। মহান আল্লাহর নির্বাচিত এইসব মহাপুরুষদের সম্বোধন করে আল্লাহ সালাম দিয়েছেন ও দরুদ পাঠিয়েছেন। যেমন, কোরআনে বলা হয়েছে, সালাম হে আলে ইয়াসিন!, সালাম হে নূহ! সালাম হে ইব্রাহিম এবং সালাম রাসূলবৃন্দ!

    হযরত মূসা (আঃ)’র যুগে সামেরি নামে বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি বাছুরের মূর্তি তৈরি করে মানুষকে ওই মূর্তি পূজার দিকে আহ্বান জানিয়েছিল। এটাই বাস্তব ঘটনা ও সত্য। অথচ বিকৃত হয়ে যাওয়া তৌরাতে হযরত মূসা (আঃ)’র ভাই এবং তাঁরই স্থলাভিষিক্ত হযরত হারুন (আঃ)-কে ওই বাছুরের মূর্তি নির্মাতা ও বাছুর পূজার আহ্বায়ক হিসেবে অপবাদ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে হযরত মূসা ও হারুন (আঃ)-এই উভয়কেই সব ধরণের শির্ক এবং মূর্তি পূজা থেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

    পবিত্র কোরআনের বাণী এত শ্রতিমধুর ও ছন্দময় যে তার বাণীগুলো মুখস্ত করা সহজ এবং কোরআনের সুরা বা আয়াতগুলো মুখস্ত করা হলে সেসব আয়াতের মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা ও বাস্তব জীবনে সেসব শিক্ষার প্রয়োগ করাও সহজ হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোরআনের অনেক হাফেজ বা মুখস্তকারী রয়েছেন। মানব ইতিহাসে আর কোনো বইয়ের এত হাফেজ নেই। বর্তমানেও যুব সমাজের অনেকেই এ মহাগ্রন্থের হাফেজ। কোরআনের তেলাওআত ও নানা আকর্ষণ তাদের জীবনকে বদলে দিচ্ছে।

    পবিত্র কোরআন অতীতের ঐশী গ্রন্থগুলোকে শ্রদ্ধা করে এবং নিজেকে সুপথ প্রদর্শনকারী অতীত ধর্মগ্রন্থগুলোর ধারাবাহিকতা বলেই মনে করে। এর পাশাপাশি এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, অতীতের ঐশীগ্রন্থগুলো বিকৃত হয়ে গেছে এবং দূর্নীতিবাজ পন্ডিত বা আলেমরাই এসব বিকৃতি ঘটিয়েছেন। ফলে এসব বইয়ের কোনো কোনো শিক্ষা মূল নীতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে। পবিত্র কোরআন অন্য ঐশী ধর্মগুলোর অনুসারীদের সাথে মুসলমানদের অভিন্ন দিকগুলো ও ইসলামী শিক্ষার শ্রেষ্ঠত্বের কথাও উল্লেখ করেছে।
    আল-কোরআন অতীতের ঐশীগ্রন্থগুলোর মধ্যে তাওরাত ও ইঞ্জিলকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এবং বহু আয়াতে ইহুদি ও খৃস্টানদের ইতিহাস তুলে ধরেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে অতীতের ধর্মগুলো ও বিশেষ করে, ইহুদি ও খৃস্ট ধর্ম আসমানি বা ঐশী ধর্মগুলোর পরিপূর্ণতার প্রক্রিয়ার অংশ। আর পরিপূর্ণতম ধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্মগুলোর পরিপূর্ণতার প্রক্রিয়াকে সম্পন্ন করেছে।

    পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে সব ঐশী ধর্মের নবী-রাসূল ও আসমানি গ্রন্থগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখা প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসী হওয়ার অন্যতম শর্ত। (সুরা বাকারার ২৮৫ নম্বর আয়াত দ্রষ্টব্য) কোরআন হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) পর্যন্ত সব মানুষকে একই পথ এবং আদর্শের ধারক-বাহক মনে করে।
    পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবীকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, তৎসমুদয়ের উপর। আমরা তাদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।”
    তাওরাত ও ইঞ্জিল শুধু বনি ইসরাইল বা ইহুদি জাতির উদ্দেশ্যে নাজেল হয়েছিল। অন্যদিকে পবিত্র কোরআনের বাণী গোটা মানব জাতির মুক্তির জন্য নাজেল হয়েছে এবং এতে রয়েছে পরিপূর্ণতম ও চিরন্তন জীবন-বিধান। এ প্রসঙ্গে সুরা তাকভিরের ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
    এটা তো কেবল বিশ্বাবাসীদের জন্যে উপদেশ, নতুন বিধান প্রণীত হলে যেমন পুরনো বিধান বাতিল হয়ে যায়, তেমনি অতীতের ধর্মগ্রন্থগুলোর বিধান বা শরিয়তও বাতিল হয়ে গেছে। তাই ওইসব গ্রন্থের শিক্ষা আর স্বতন্ত্রভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতের ধর্মগ্রন্থের যে অংশগুলো কোরআনের বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কেবল সেগুলোই গ্রহণযোগ্য। সুরা আলে ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, একমাত্র ইসলামই আল্লাহর কাছে মনোনীত ধর্ম।
    একই সুরার ৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।”

    পাঁচ.

    এ পর্বে আমরা অন্য ঐশী ধর্মগ্রন্থগুলোর তুলনায় পবিত্র কোরআনের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে একজন ফরাসি বিশেষজ্ঞের মতামত তুলে ধরব। ডক্টর মরিস বুকাইলি ” বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞানের তুলনা” শীর্ষক বইয়ে পবিত্র কোরআনের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে গবেষণালব্ধ অনেক মূল্যবান মত ব্যক্ত করেছেন।
    অধ্যাপক মরিস বুকাইলি ১৯২০ সালে ফ্রান্সের এক খৃস্টান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশুনার পর তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি ক্লিনিকের প্রধান নির্বাচিত হন। বুকাইলি কয়েক বছর ধরে পবিত্র ধর্ম গ্রন্থগুলো ও আধুনিক প্রযুক্তির নানা আবিস্কারের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন এবং অবশেষে কোরআনের আয়াত নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
    বুকাইলি পবিত্র কোরআনের জ্ঞান-সাগরে অবগাহনের জন্য প্রথমে আরবী ভাষা শেখেন। বিভিন্ন বিষয়ে কোরআনের কিছু বাণী তাকে অভিভূত করে। তিনি বলেছেন, “একত্ববাদী তিনটি ধর্ম তথা ইসলাম, ইহুদি ও খৃস্ট ধর্মের রয়েছে নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ। এই গ্রন্থগুলো ইহুদি, খৃস্টান ও মুসলমানদের ধর্ম-বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ-ভিত্তিক তথ্য আমাদেরকে নবী-রাসূলদের ওপর নাজেল হওয়া প্রত্যাদেশ বা ওহীগুলো মেনে নিতে বাধ্য করে। অবশ্য খৃস্টানরা এই নীতি মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। হযরত ঈসা (আঃ)’র যুগের ছয় শতক পর নাজেল হওয়া ধর্মগ্রন্থ কোরআনে তাওরাত ও ইঞ্জিল সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বক্তব্য রয়েছে। কোরআন মুসলমানদের পূর্ববর্তী ঐশী গ্রন্থগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখার এবং আল্লাহর নবীদের উচ্চ মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। কোরআন হযরত নুহ, ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসা (আঃ)’র মত মহান নবীদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে বলেছে।”

    বুকাইলি আরো বলেছেন,« ইঞ্জিল বা বাইবেলের মত কোরআনেও হযরত ঈসা (আঃ)’র জন্মগ্রহণের ঘটনাকে মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত মরিয়ম (সাঃ)’র প্রতি কোরআনের রয়েছে বিশেষ শ্রদ্ধা। এ ধর্মগ্রন্থের ১৯ নম্বর সুরাটির নাম “মরিয়ম”। কিন্তু এ সত্য স্বীকার করতে হবে যে, হযরত ঈসা (আঃ) ও মরিয়ম (সাঃ)’র প্রতি কোরআনের শ্রদ্ধা বা প্রশংসাগুলো পাশ্চাত্যের সাধারণ জনগণের মধ্যে অজানাই রয়ে গেছে।

    ডক্টর মরিস বুকাইলি ইসলামের হাদীস শাস্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, ” হাদীসে মহান ব্যক্তিদের জীবনী, তাদের চিন্তাধারা ও বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে। যারা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)’র জীবনী উদ্ধৃত করেছেন তারা তাঁরই পাশে ছিলেন এবং খুব কাছ থেকে তাঁর নৈতিক ও চারিত্রিক গুণগুলো লক্ষ্য করেছেন। কিন্তু বাইবেল বা ইঞ্জিলের চারটি প্রধান সংস্করণ হিসেবে স্বীকৃত কিংবা বহুল প্রচলিত সংস্করণগুলোর সংগ্রহকারী এবং ওই বইগুলোতে উল্লেখিত হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কিত নানা ঘটনার বর্ণনাকারীরা ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ্যদর্শী নন।”

    ডক্টর মরিস বুকাইলি লিখেছেন, ” কোরআন ও বাইবেলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হল, বাইবেলের বক্তব্য বা বাণীগুলো সমন্বিত নয়, বরং বিচ্ছিন্ন সূরের। কিন্তু কোরআনের বাণীগুলো সমন্বিত ও একই সূরে গ্রন্থিত। কোরআন হল ওহী বা ঐশী প্রত্যাদেশ যা মহান আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আঃ)’র মাধ্যমে মুহাম্মদ (সাঃ)’র ওপর নাজেল হয়েছে। এসব ওহী আসার পর পরই ওহী লেখকদের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ এবং মুখস্ত করে ফেলা হত। এ ছাড়াও ওহীর আয়াতগুলো তেলাওয়াত করা হত নামাজের মধ্যে ও বিশেষ করে রমজান মাসে। মুহাম্মাদ (সাঃ)’র জীবদ্দশাতেই কোরআন বিভিন্ন সুরার আকারে বিন্যস্ত হয়েছিল।”
    পবিত্র কোরআন সম্পর্কে বুকাইলি লিখেছেন, ” মুহাম্মাদ (সাঃ)’র মৃত্যুর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই কোরানের সুরাগুলো একত্র করে সংকলিত করা হয়। অন্যদিকে বাইবেল মূলতঃ বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্য-ভিত্তিক বর্ণনা এবং এসব বর্ণনায় পরোক্ষভাবে হযরত ঈসা (আঃ)’র বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।”
    ডক্টর মরিস বুকাইলি আরো লিখেছেন, ” অতীতে পন্ডিতদের এ মত খুবই দৃঢ় ছিল যে, বিজ্ঞান ও পবিত্র গ্রন্থগুলোর মধ্যে পরিপূর্ণ সমন্বয় বা সঙ্গতি রয়েছে। খৃস্টান পাদ্রি সেন্ট অগাস্টিন তার ৮২ নম্বর চিঠিতে স্পষ্টভাবে এই সমন্বয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তিনি বিজ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে এটা লক্ষ্য করেছেন যে বিজ্ঞান ও পবিত্র গ্রন্থগুলোর মধ্যে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। তাই তিনি পরে সিদ্ধান্ত নেন যে বিজ্ঞান ও পবিত্র গ্রন্থগুলোর মধ্যে আর কখনও তুলনা করবেন না। অথচ কোরআনের শিক্ষাগুলোর সাথে বিজ্ঞানের কোনো বৈপরীত্য বা সংঘাত নেই। “

    মরিস বুকাইলি অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও নির্মোহ মন নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে কোরআনের সাজুয্য বা সঙ্গতি নিয়ে গবেষণা শুরু করে এটা দেখতে পান যে, কোরআনের শিক্ষাগুলোর সাথে বিজ্ঞানের সঙ্গতি রয়েছে। একইভাবে অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও নির্মোহ মন নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তাওরাত বা ওল্ড টেস্টাম্যান্ট ও বাইবেলের মিল-অমিল সম্পর্কেও গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণার ফল সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ” আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তাওরাত বা ওল্ড টেস্টাম্যান্টের অসঙ্গতি স্পষ্টই ছিল। বাইবেল খোলার পরও খুব দ্রুত এটা বোঝা যায় যে, লুকের বাইবেল ও মথির বাইবেলে হযরত ঈসা (আঃ)’র বংশ-পরিচয় সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য রয়েছে। লুকের বাইবেলে পৃথিবীতে মানুষের আগমন বা আবির্ভাবের সময়কাল সম্পর্কে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

    ইব্রাহিমী তিন ধর্ম তথা ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্ট – এ তিন ধর্মেই নুহ (আঃ)’র যুগের প্লাবন হওয়ার কথা বিশ্বাস করে। বুকাইলি এ ব্যাপারে তিন ধর্মের বর্ণনার তুলনা করেছেন এবং এ সংক্রান্ত কোরআনের বর্ণনার শ্রেষ্ঠত্ব কথা তুলে ধরে বলেছেন, “এ ঘটনার ব্যাপারে কোরআনের বর্ণনা পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র। এ বর্ণনার সাথে ইতিহাসের কোনো বিরোধ দেখা যায় না। কিন্তু বাইবেল ও ইঞ্জিলে এ সম্পর্কে ভিন্ন যুগে লেখা দুই ধরনের ভাষ্য পাওয়া যায়। কোরআন এ মহাপ্লাবনকে নুহের জাতির প্রতি আল্লাহর শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। আর কোরআনের এ সংক্রান্ত বক্তব্যের সাথে বিজ্ঞানের নতুন গবেষণা-লব্ধ ফলাফলের কোনো পার্থক্য নেই। “

    আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে কোরআনের এই অসাধারণ ও নজিরবিহীন মিলকে সত্যিকার অর্থেই বিস্ময়কর বলে উল্লেখ করেছেন বুকাইলি। তিনি লিখেছেন, “পাশ্চাত্যের ধর্মের জ্ঞান বলতেই ইহুদি ও খৃস্ট ধর্মের জ্ঞানকে বোঝানো হয় এবং এক্ষেত্রে ইসলামের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেয়া হয় না। কোরআন সম্পর্কে পাশ্চাত্যের এসব দৃষ্টিভঙ্গি অজ্ঞতা, অবিচার ও বিদ্বেষের ফল। যেমন, ইউনিভার্সেলিস বিশ্বকোষের ৬ নম্বর খন্ডে লেখক কোরআনকে ব্যক্তিগত জীবনী বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ সবাই জানেন যে ব্যক্তিগত জীবনীর সাথে কোরআনের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এতে রয়েছে সতর্কবাণী ও সুসংবাদ। জ্ঞান সম্পর্কে ইসলামের নীতিও স্পষ্ট।” রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে চীনে যাও” এবং “মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন ফরজ।”
    বুকাইলির মতে কোরআনে বিশ্ব জগত, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রাণী ও উদ্ভিদ বিদ্যা, মানুষের জন্ম-রহস্য এবং ভূ-তত্বসহ বহু বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ অনেক আয়াত রয়েছে। অথচ তাওরাত ও বাইবেলে বিজ্ঞান সম্পর্কিত যেসব মারাত্মক ভুল দেখা যায় কোরআনে সেগুলো নেই। বুকাইলি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, সেই ১৪০০ বছর আগে কোনো মানুষের পক্ষে আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এতসব বিষয় লেখা কি সম্ভব? অর্থাৎ নিঃসন্দেহে কোরআন অবিকৃত ও খোদায়ী গ্রন্থ।(রেডিও তেহরান)