ইসলামী সূত্র

  • features

    1. home

    2. article

    3. সূরা বাকারাহ; আয়াত ৬১-৬৪ (পর্ব ২২)

    সূরা বাকারাহ; আয়াত ৬১-৬৪ (পর্ব ২২)

    সূরা বাকারাহ; আয়াত ৬১-৬৪ (পর্ব ২২)
    Rate this post

    সূরা বাকারাহ’র ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
    وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نَصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَقْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَا قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَا سَأَلْتُمْ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ وَالْمَسْكَنَةُ وَبَاءُوا بِغَضَبٍ مِنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا يَكْفُرُونَ بِآَيَاتِ اللَّهِ وَيَقْتُلُونَ النَّبِيِّينَ بِغَيْرِ الْحَقِّ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ (61)

    “(হে বনী ইসরাইল) যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্য্য ধারণ করতে পারবো না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর,তিনি যেন ভূমিজাত দ্রব্য শাক-সব্জী,কাঁকুড়, রসুন বা গম,মসুর ও পিয়াঁজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন। মূসা বললেন, তোমরা কি উৎকৃষ্ট জিনিসকে নিকৃষ্ট জিনিসের সাথে বদল করতে চাও? তাহলে এই উপত্যকা থেকে বের হয়ে অন্য কোন শহরে যাও। তোমরা যা চাও তা সেখানে আছে। তারা লাঞ্ছনা ও দরিদ্রগ্রস্ত হলো এবং তারা অল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো, এটা এ জন্যে যে তারা আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শনকে অস্বীকার করতো এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের জন্যই তাদের এ পরিণতি হয়েছিল। ” (২:৬১)
    মহান আল্লাহ শুষ্ক মরুভূমিতে বনি ইসরাইল বংশের জন্য পানি ও খাবারের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও ইহুদীরা একদিকে অকৃতজ্ঞ এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রত্যাশী ও স্বার্থপর ছিল বলে হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আরো বেশী খাবারের জন্য দাবি করল। মূসা (আঃ) তাদেরকে জবাবে বললেন, প্রথমত: তোমরা উত্তম স্বর্গীয় খাদ্যের পরিবর্তে নিকৃষ্ট খাদ্য চাচ্ছো। দ্বিতীয়ত: এ ধরনের খাবার পেতে হলে তোমাদেরকে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে এবং এমন এক শহরে যেতে হবে যেখানে তোমরা ওইসব খাবার পেতে সক্ষম হবে। তোমরা যুদ্ধ ও জেহাদের জন্য প্রস্তুত নও অথচ সমস্ত নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে চাও। তোমাদের এ ধরনের ভোগবাদী বা খাই-খাই মনোভাব তোমাদেরকে লাঞ্ছনা ও দূর্দশার মধ্যে ফেলেছে এবং তোমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসবে। তোমরা এ ধরনের অন্যায় দাবি জানিয়ে আল্লাহর নিদর্শন ও ক্ষমতাকে উপহাস করেছ। এমনকি তোমরা আল্লাহর নবীগণকে বৈষয়িক ও পার্থিব স্বার্থ অর্জনের পথে বাধা দেয়ার জন্য হত্যা করেছ।
    এই আয়াত থেকে এটাই বোঝা যায় যে, স্বার্থপরতা ও ভোগ-লিপ্সার পরিণতি হল ধ্বংস। যে কোন ধরনের সুবিধাবাদের পরিণাম হলো অমর্যাদা ও লাঞ্ছনা। তাই মানুষকে এ অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হবে।(রেডিও তেহরান)
    এরপর ৬২নং আয়াতে বলা হয়েছে-
    إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (62)
    “যারা ঈমান এনেছে, ইহুদী, খ্রিস্টান ও সাবেঈনদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার আছে ও তাদের জন্য কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।” (২:৬২)
    যে কোন ঐশী ধর্মে পারলৌকিক পুরস্কারের শর্ত হিসাবে বিশ্বাস ও সৎকর্মের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, পুনরুত্থান বা বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর নির্দেশাবলী মেনে চলার মাধ্যমে ঐশী পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদী ও অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে কোন বৈষম্য করা হয়নি। অবশ্য পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে ইহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। সূরা আল ইমরানের ৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মের অনুসরণ করলে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। তাই যারা নিজেদের যুগের নবীর প্রতি এবং তাদের ওপর অবতীর্ণ ঐশী গ্রন্থের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পাশাপাশি ওই গ্রন্থের বিধান অনুযায়ী নিজেদের দায়িত্ব পালন ও সৎকর্ম করেছে, শুধুমাত্র তারাই ঐশী পুরস্কার লাভ করবে। কিন্তু ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের সাথে সাথে অন্যকোন ধর্মেরই আর গ্রহণযোগ্যতা নেই। সূরা বাকারাহ’র ৬২ নম্বর আয়াতে যেসব ঐশী ধর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসবের মধ্যে একটি হলো সাবেঈনদের ধর্ম। এরা সম্ভবত: হযরত নূহ নবী অথবা ইব্রাহীম (আঃ) বা ইয়াহিয়া (আঃ)-এর অনুসারী ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভুল চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটে। সাবেঈনরা গণকবিদ্যা বা জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। এই আয়াত থেকে এটাও স্পষ্ট যে, সব ঐশী ধর্ম একত্ববাদ ও পুনরুত্থানের ব্যাপারে একমত এবং বিশ্বাস ও সৎকাজকেই মুক্তির উপায় বলে মনে করে। অযৌক্তিক বিশ্বাস ও আকাঙ্খা এই সব ধর্ম অনুযায়ী মুক্তির উপায় নয়।
    সূরা বাকারাহ’র ৬৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
    وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ وَرَفَعْنَا فَوْقَكُمُ الطُّورَ خُذُوا مَا آَتَيْنَاكُمْ بِقُوَّةٍ وَاذْكُرُوا مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (63)
    “আর আমি যখন তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তুর পর্বতকে তোমাদের মাথার ওপর তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে,তোমাদিগকে যে কিতাব (তওরাত) দেয়া হয়েছে তা দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং এতে যা কিছু রয়েছে তা মনে রেখ যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পার।” (২:৬৩)
    হযরত মূসা (আঃ)কে যখন তাওরাত গ্রন্থ দেয়া হয়, তখন আল্লাহ বনী ইসরাইলীদের কাছ থেকে এ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে,ওই গ্রন্থের নির্দেশ তারা মান্য করবে এবং যে কোন ধরনের অবহেলা থেকে বিরত থাকবে, যাতে তারা খোদা ভীরু হতে পারে। খোদার সাথে অঙ্গীকারের পর তারা কি করেছিল তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে পরবর্তী আয়াতে। ওই আয়াতে বলা হয়েছে,
    ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ فَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَكُنْتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ (64
    “এরপরও তোমরা বিমুখ হলে,সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ ও অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।” (২:৬৪)
    বনি ইসরাইলীরা আল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ হবার পরও ঐশী নির্দেশকে অমান্য করে। কিন্তু দয়াময় আল্লাহ দয়া করে পুনরায় তাদেরকে শাস্তি দান থেকে বিরত থাকেন।
    এ আয়াতগুলোর শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
    এক. অতিরিক্ত পাবার ইচ্ছে বা লোভ ও স্বার্থপরতা মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে ধ্বংস করে। স্বার্থপরতা ও অতিরিক্ত পাবার ইচ্ছা মানুষের জন্য লাঞ্ছনা ও দূর্গতি ডেকে আনে। এর ফলে মানুষ বৈষয়িক স্বার্থ অর্জনের জন্য আল্লাহর বিধানকে পদদলিত করতে প্রস্তুত হয়।
    দুই. পাপ বা অপরাধ এবং অবাধ্যতা মানুষকে পর্যায়ক্রমে কুফরী বা অবিশ্বাসের দিকে টেনে নেয় এবং সত্যকে অস্বীকার করার মনোভাব তার মধ্যে সৃষ্টি হতে থাকে
    তিন. প্রকৃত শান্তি শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি এবং পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাসের মধ্যেই রয়েছে। এই বিশ্বাসের জন্য তাদেরকে উজ্জ্বল ভবিষ্যত বা সৌভাগ্যের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।