ইসলামী সূত্র

  • features

    1. home

    2. article

    3. সূরা বাকারাহ; আয়াত ৬৫-৬৯ (পর্ব ২৩)

    সূরা বাকারাহ; আয়াত ৬৫-৬৯ (পর্ব ২৩)

    সূরা বাকারাহ; আয়াত ৬৫-৬৯ (পর্ব ২৩)
    Rate this post

    সূরা বাকারাহ’র ৬৫ ও ৬৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
    وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنْكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ (65) فَجَعَلْنَاهَا نَكَالًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهَا وَمَا خَلْفَهَا وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ (66)

    “তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের সীমা লঙ্ঘন করেছিল,তাদের (পরিণতি) তোমরা নিশ্চিতভাবে জানো। আমি তাদের বলেছিলাম-অধম বানর হয়ে যাও। আমি এটা তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীগণের জন্য দৃষ্টান্ত এবং সাবধানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ করেছি।” (২:৬৫-৬৬)
    এখানে বনি ইসরাইলীদের আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি হল- মহান আল্লাহ তাদের জন্য শনিবারকে বিশ্রামের দিন ঘোষণা করেছিলেন। অর্থাৎ শনিবারে কাজ-কর্ম নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী একদল ইহুদী এক ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে শনিবারে মাছ ধরতো। তারা সাগরের প্রান্তে এক ধরনের ফাঁদ বা গর্ত তৈরি করতো এবং ওইসব গর্তে মাছ প্রবেশ করার পর গর্তের মুখ বা প্রবেশপথ বন্ধ করে দিত এবং পরের দিন অর্থাৎ রোববারে ওইসব মাছ ধরতো। আর এভাবে তারা আল্লাহর নির্দেশকে অবজ্ঞা করেছিল। আল্লাহও তার বিধানকে অমান্য করা ও ঐশি বিধি-বিধানকে অবজ্ঞা করার শাস্তি হিসাবে

    তাদের চেহারাকে বিকৃত করে দেন এবং তাদেরকে বানরে রূপান্তরিত করেন যাতে অন্যরাও এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। যদিও পশুরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত নয়, কিন্তু মানুষকে পশুতে রূপান্তর করার মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে নিজের দরবার ও অনুগ্রহ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
    এরপর ৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
    وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ (67
    “স্মরণ কর যখন মূসা আপন সম্প্রদায়কে বলেছিল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাই করার আদেশ দিয়েছেন, তারা বলেছিল-তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ? মূসা বলল, আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি,যাতে মূর্খদের অন্তর্ভূক্ত না হই।” (২:৬৭)
    এখানে বনী ইসরাইলের গরুর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ কারণেই এই সূরার নাম বাকারাহ অর্থাৎ গরু রাখা হয়েছে। ৬৭ থেকে ৭৩তম আয়াতে এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ঘটনাটি হলো, বনী ইসরাইলীদের মধ্যে নিহত এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেল। কিন্তু হত্যাকারী কে তা জানা গেল না। এ নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলো। প্রত্যেক গোত্রই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য অন্যান্য গোত্রকে দায়ী করছিল। অবশেষে এ বিবাদের মীমাংসার জন্য বনী ইসরাইলের লোকেরা হযরত মূসা (আঃ)-এর শরণাপন্ন হলো। যেহেতু সাধারণ উপায়ে এ সমস্যার সামাধান করা সম্ভব ছিল না, তাই হযরত মূসা (আঃ) অলৌকিক পন্থায় এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন। তিনি বনী ইসরাইলীদের বললেন, আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, একটি গরু জবাই করতে হবে। এরপর জবাই করা গরুর এক টুকরো গোশত নিহত ব্যক্তির গায়ে স্পর্শ করলে সে জীবিত হয়ে হত্যাকারীর নাম বলে দেবে।” তারা এই নির্দেশ শুনে মূসা (আঃ)কে বলল, এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছো ? হযরত মূসা (আঃ) জবাবে বললেন, ঠাট্টা বিদ্রুপ করা অজ্ঞ লোকদের কাজ। আল্লাহর নবীরা কখনও এমনটি করেন না। যদি হত্যাকারীকে চিহ্নিত করতে চাও তবে নির্দেশিত এই কাজ করতে হবে।
    এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকটি হচ্ছে, যদি আল্লাহর নির্দেশ আমাদের রুচি ও জ্ঞান অনুযায়ী বোধগম্য না হয়, তাহলেও তাকে অবজ্ঞা করা আমাদের উচিত নয় এবং কখনোই এ ধরনের নির্দেশকে হালকা ও গুরুত্বহীন মনে করা যাবে না। আল্লাহ ইচ্ছে করলে, অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে হত্যাকারীর নাম বা পরিচয় মূসা (আঃ)কে বলে দিতে পারতেন,কিন্তু গরু জবাইয়ের নির্দেশের মাধ্যমে আল্লাহ ইহুদীদের মধ্য থেকে বাছুর বা গরুভক্তি বা গরু পূজার প্রচলন ও এ ধরনের মানসিকতা দূর করতে চেয়েছিলেন।
    এরপর ৬৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
    قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنْ لَنَا مَا هِيَ قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ لَا فَارِضٌ وَلَا بِكْرٌ عَوَانٌ بَيْنَ ذَلِكَ فَافْعَلُوا مَا تُؤْمَرُونَ (68
    “বনী ইসরাইলীরা মূসাকে বলেছিল,তুমি আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল যে, তা কি রকম গরু? মূসা বলল, তিনি অর্থাৎ আল্লাহ বলেছেন, সেই গরু বৃদ্ধও নয়, অল্প বয়স্ক বা শাবকও নয়-মধ্য বয়সী। অতএব তোমরা যেমন আদেশ পেলে তেমনই কর।” (২:৬৮)

    যখন ইহুদীরা বুঝতে পারলো যে, গরু জবাই করার আদেশ সত্যি বা অবশ্য করণীয়, তখন তারা বিভিন্ন ধরনের টালবাহানা শুরু করল এবং জানতে চাইল কোন ধরনের গরু জবাই করতে হবে? সম্ভবত এ ধরনের প্রশ্ন প্রকৃত হত্যাকারীর পক্ষ থেকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়, যাতে এই অপরাধ বা কেলেঙ্কারীর হোতাকে জনগণ চিনতে না পারে। যদিও প্রশ্ন করা ভালো লক্ষণ এবং প্রশ্নের মাধ্যমে অনেক অস্পষ্টতা দূর হয়, কিন্তু ইহুদীরা এ ধরনের প্রশ্ন তুলে উপলদ্ধি বা বোঝার পরিবর্তে দায়িত্ব পালন না করার চেষ্টা করছিল। তাই তারা অভদ্রভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে, যেমন তারা বলেছে, ‘হে মূসা! তোমার খোদার কাছে প্রার্থনা কর।’ ভাবটা এমন যে, মূসা (আঃ)এর খোদা ও তাদের খোদা যেন দুই ভিন্ন খোদা।
    এরপর এই সূরার ৬৯ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন-
    قَالُوا ادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُبَيِّنْ لَنَا مَا لَوْنُهَا قَالَ إِنَّهُ يَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةٌ صَفْرَاءُ فَاقِعٌ لَوْنُهَا تَسُرُّ النَّاظِرِينَ (69
    “তারা বলল- তুমি আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা কর, তিনি যেন আমাদের গরুর রং কেমন তা বর্ণনা করেন। মুসা বললেন, তিনি ( আল্লাহ) বলেছেন, সেই গরুর বর্ণ গাঢ় হলুদ যা দর্শকদেরকে আনন্দ দেয়।” (২:৬৯)
    পুনরায় যখন গরু জবাইয়ের নির্দেশ দেয়া হল, তখনও তারা ওই নির্দেশ পালনে অনিচ্ছুক ছিল। তাই তারা আরো প্রশ্ন করা শুরু করে এবং জানতে চায় যে, ওই গরুর রং কেমন হতে হবে? অথচ আল্লাহর প্রথম নির্দেশে গরুর কোন নির্দিষ্ট রঙের কথা উল্লেখ করা ছিল না। যদি রঙের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হত তবে আল্লাহ প্রথম নির্দেশেই তা উল্লেখ করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাদের অজুহাত সৃষ্টির পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য পরে নির্দিষ্ট রঙের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে তারা এটাও যেন বুঝতে পারে, যে গরুর জবাইয়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা যেন কুৎসিৎ ও অকেজো বা মূল্যহীন না হয়ে মধ্য বয়স্ক এবং চোখ জুড়ানো উজ্জ্বল রঙের হয়।
    সূরা বাকারাহ’র ৬৫ নম্বর থেকে ৬৯ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-
    এক. আল্লাহর নির্দেশ মান্য করার ক্ষেত্রে প্রতারণা বা ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেয়া যাবে না। ধর্মের শুধু বাহ্যিক দিক রক্ষা করে আমরা যেন খোদার বিধানের মূল বিষয়কে পরিবর্তন না করি। কারণ বাহ্যিক দিক নয় বরং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা লক্ষ্যই হল খোদার বিধানের মূল দিক। তাই মর্মার্থ হতে দূরে থেকে ধর্মের চেহারাকে বিকৃত করা হলে মানবতার মূল চেহারা বা প্রকৃতি বা চরিত্রেও বিকৃতি দেখা দেবে। বনী ইসরাইলের মধ্যে যারা শনিবারে মাছ ধরতো তাদের মধ্যে এ বিকৃতি দেখা দেয়।
    দুই. খোদায়ী শাস্তি শুধু পরকালের জন্যই নির্ধারিত নয়, অনেক সময় আল্লাহ কোন কোন অপরাধের জন্যে পৃথিবীতেই শাস্তি দিয়ে থাকেন, যাতে করে ওই যুগের মানুষ ও ভবিষ্যত প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা নেয়।
    তিন. আল্লাহর বিধানকে আমরা যেন ঠাট্টা ও উপহাস না করি। বরং আল্লাহর বিধানের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে যেসব নির্দেশ বা বিধান দিয়েছেন তা মানবসমাজের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যই দিয়েছেন। (রেডিও তেহরান)