ইসলামী সূত্র

  • features

    1. home

    2. article

    3. সূরা হুদ- পর্ব : ১২

    সূরা হুদ- পর্ব : ১২

    সূরা হুদ- পর্ব : ১২
    Rate this post

    সূরা হুদের ৪৫ থেকে ৪৯ নম্বর  আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ “নূহ তার প্রতিপালককে সম্বোধন করে বললেন, হে আমার প্রতিপালক, আমার পুত্র আমার পরিবারভুক্ত এবং (আমার পরিজনদের মুক্তির ব্যাপারে) আপনার প্রতিশ্রুতিও সত্য এবং আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক। (এর জবাবে) আল্লাহ বললেন, হে নূহ! সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়, সে অসৎ কর্মপরায়ণ। সুতরাং যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সে বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি তুমি যেন অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হও।”

    এর আগের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে এবং আপনাদেরও নিশ্চয় মনে আছে যে, হযরত নূহ (আঃ)এর পুত্র নৌকায় উঠতে রাজী হয়নি এবং সে অবিশ্বাসী কাফেরদের সাথে মহাপ্লাবনে নিমজ্জিত হয়েছে। এই ঘটনার পর আল্লাহর সাথে হযরত নূহ (আঃ)এর যে কথোপকথন হয় ৪৫ ৪৬ নম্বর আয়াতে তাই ইঙ্গিত করা হয়েছে। হযরত নূহ আল্লাহকে বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক আমার পরিজনদের রক্ষার ব্যাপারে আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আপনার প্রতিশ্রুতি সন্দেহাতীতভাবে সত্য। তাহলে আমার পুত্র যে কিনা আমার পরিবারেরই অংশ, সে কেন নিমজ্জিত হলো? আল্লাহ এর জবাবে বলেছিলেন, আমার প্রতিশ্রুতি সত্য, তবে তোমার পুত্র তোমার পরিজনদের অংশ হিসাবে পরিগণ্য হবে না। কারণ সে ইমান আনতে অস্বীকার করেছে এবং দুরাচারদের কাতারে শামিল হয়ে নিজেও অসৎকর্মপরায়ণ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।

    এসব কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, হযরত নূহ (আঃ) এটা সুস্পষ্টভাবে জানতেন না বা তিনি বুঝতে পারেননি যে, তার পুত্র সত্যিই কাফের হয়ে গেছে এবং সেও নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। তাই যখন তিনি মোমিন বিশ্বাসীদেরকে কিশতিতে উঠানোর নির্দেশ পেলেন, তখন পুত্রকেও তাতে উঠার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু যখন তার পুত্র কেনআন নৌকায় উঠতে অস্বীকৃতি জানালো তখন তিনি বলেছিলেন, ” তুমি কাফেরদের অনুগামী হয়ো না। তিনি এটা বলেন নি যে, তুমি কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এতে বোঝা যায়, কেনআনের কাফের হওয়ার বিষয়টি হযরত নূহ (আঃ)এর কাছে সুস্পষ্ট ছিল না। এ জন্যই আল্লাহপাক হযরত নূহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, যে বিষয়ে তুমি অবহিত নও সে বিষয়ে তুমি আমার কাছে কোন আবেদন করো না, কারণ এটা অজ্ঞদের কাজ। হযরত নূহ (আঃ)এর অনুসারীরা নবীর পরিজন হিসাবে বিবেচিত হয়ে মহা প্লাবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। অপর দিকে ইমান না আনার কারণে হযরত নূহের পুত্রও নবীর পরিজন হিসাবে বিবেচিত হয়নি। বরং সেও কাফেরদের সাথে নিমজ্জিত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, আত্মীয়তার চেয়ে ধর্মীয় বন্ধনের গুরুত্ব অনেক বেশী। আল্লাহর বিধানে ইমান ও তাকওয়া হচ্ছে মুখ্য বিষয়। নবীর পুত্র হিসাবে কোন বাড়তি শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এই আয়াত থেকে আমরা আরেকটি বিষয় উপলদ্ধি করতে পারি তা হচ্ছে, আল্লাহর কাছে কোন দোয়া বা আর্জি পেশ করার পর তা কবুল না হলে তাতে মনক্ষুন্ন হওয়া উচিত নয়। কারণ অনেক কিছুই আমরা জানি না যা আল্লাহ পাক জানেন।

    এবার এই সূরার ৪৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ ” হযরত নূহ (আঃ) বললেন, হে আমার প্রতিপালক, যে বিষয়ে আমার জানা নেই, সে বিষয়ে আপনাকে যাতে অনুরোধ না করি এ জন্য আমি আপনার আশ্রয় চাচ্ছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন তবে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবো।”

    আল্লাহ তালার উপদেশ পাওয়ার পর হযরত নূহ (আঃ) তার অনুচিত আর্জির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তার রহমত ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করেন। কারণ পয়গম্বর ভালো করেই জানেন ঐশী নসিহত লাভের পর কিভাবে সৃষ্টিকর্তার সামনে বিনয় প্রকাশ করা উচিত। মানবীয় দুর্বলতার কারণে মানুষ ভুল করে অনুচিত, অসঙ্গত আচরণ করে ফেলে, তাই ভুল শোধরানোর জন্য ঐশী বিধানে তওবা, এস্তেগফার অর্থাৎ অনুশোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনার বিধান রাখা হয়েছে। তওবা, এস্তেগফারের মাধ্যমে মানুষ পুণরায় ঐশী কল্যাণ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে। কারণ আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ সাধারণ মানুষের জন্য তো বটেই, নবী রাসূলদের জন্যও তা জরুরী। এছাড়া নবী রাসূলরাও কাঙ্খিত লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে না। যারা এ থেকে বঞ্চিত হয় তারা প্রকৃতই ক্ষতিগ্রস্ত।

    এবারে সূরা হুদের ৪৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ “হযরত নূহকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো, হে নূহ! অবতরণ কর আমার দেয়া শান্তিসহ এবং তোমার প্রতি ও যে সমস্ত সম্প্রদায় তোমার সাথে আছে তাদের প্রতি কল্যাণসহ। অন্যান্য সম্প্রদায় (যারা নাজাতপ্রাপ্ত) আমি তাদেরকে জীবন উপভোগ করতে দেব। অত:পর (অবিশ্বাসী কাফের ও ধর্মের ব্যাপারে উদাসীনদের) উপর আমার কঠিন শাস্তি অর্পিত হবে।”

    বন্যার পানি নিঃশেষ হওয়ার পর কিশতি যখন মাটি পেল, হযরত নূহ (আঃ) সঙ্গী-সাথীসহ নৌকা থেকে নেমে আসলেন। তারা আল্লাহর অফুরন্ত কল্যাণ এবং বিশেষ অনুগ্রহ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করলেন। তাদের মাধ্যমেই পৃথিবীতে পুণরায় মানব বংশের ধারা রচিত হলো। এখানে লক্ষ্য করার মত চমৎকর একটি বিষয় হচ্ছে, হযরত আদম(আঃ)কে আল্লাহতালা অবতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে হযরত নূহ (আঃ)ই মানব জাতির দ্বিতীয় পিতা। মহাপ্লাবনে সব ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পর হযরত নূহ ও তার অনুসারী মোমিনদের মাধ্যমেই পৃথিবীতে পুণরায় মানব বংশের বিস্তার ঘটে। এরপর ক্রমান্বয়ে মানব জাতি পুণরায় মোমিন ও কাফের দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মোমিনদের প্রতি আল্লাহর দেয়া কল্যাণ শান্তি, সৌভাগ্য ও প্রাচুর্য বয়ে আনে। অপর দিকে অবিশ্বাসী কাফেররা যে কল্যাণপ্রাপ্ত হয় তা বস্তুজগতেই তাদেরকে তৃপ্ত করে। আল্লাহ কোন অবিশ্বাসী কাফেরকে পার্থিব জগতের সুখ বা সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেন না। তিনি সকলকেই তা প্রদান করেন এজন্য যে, সকলেই যেন ঐশী পুরস্কার ও শাস্তির বিষয়টি উপলদ্ধি করতে পারে।

    এবার সূরা হুদের ৪৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে, অর্থাৎ “এ সমস্ত অদৃশ্য লোকের সংবাদ আমি তোমাকে (হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কে) ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করেছি যা এর আগে তুমি জানতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানতো না, সুতরাং ধৈর্য্য ধারন কর, শুভ পরিণাম সাবধানীদের জন্য।”

    এই আয়াতের মধ্য দিয়ে হযরত নূহ (আঃ) ও তার সম্প্রদায়ের বর্ণনা শেষ হয়েছে। ঘটনা বর্ণনার পর এই আয়াতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, এই ঘটনা আপনার জন্য এবং আপনার উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। এ ঘটনা থেকে বোঝা গেল,যারা মোমিন এবং পবিত্র অন্তরের অধিকারী বিজয় তাদের জন্য অবধারিত। তবে এই বিজয় শর্ত যুক্ত। স্থিতিশীল ধৈর্য্য এবং দৃঢ়তা চুড়ান্ত বিজয়ের জন্য অবশ্যম্ভাবী। যেমনি হযরত নূহ (আঃ)তার অনুসারীরা ধৈর্য্য, সহনশীলতা এবং চিত্তের দৃঢ়তার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন।